রূপান্তরের অন্তরালে ও সত্তার অবক্ষয়
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন কলকাতার চেনা রাজপথের ওপর এসে পড়ছিল, তিলোত্তমার চোখের দিকে তাকিয়ে অর্কের মনে হলো -সে এক অচেনা গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছে।
ক্যাফেটার কোনার টেবিলটায় তখন আবছা অন্ধকার জমে উঠেছে। কাঁচের জানালার বাইরে শ্রাবণের মেঘলা আকাশ। টেবিলের ওপর রাখা দুটো কফির কাপ থেকে এতক্ষণ যে ধোঁয়া উঠছিল, তাও এখন মরে বরফ হয়ে গেছে। ঠিক যেমন করে দুটো মানুষের ভেতরের চেনা ওমটুকু আস্তে আস্তে জুড়িয়ে যায়।
অর্ক বহুক্ষণ ধরে চুপচাপ লক্ষ্য করছিল তিলোত্তমাকে। তিলোত্তমা সামনে বসেও যেন কোথাও নেই। সে তার ফোনের স্ক্রিনে অতিব্যস্ত আঙুল বোলাচছে, মাঝেমধ্যে জানালার কাঁচ ভেদ করে বাইরের চলন্ত ট্রাফিকের দিকে তাকাচ্ছে। তার বসার ভঙ্গিতে এক ধরণের নাগরিক তাড়া, চেনা চোখের কোণায় এক অদ্ভুত যান্ত্রিক উদাসীনতা।
যে তিলোত্তমা একসময় অর্কের চোখের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতে পারত, আজ সে একই কাঠের টেবিলের ওপারে বসেও যেন মাইলের পর মাইল দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানের এই সামান্য দূরত্বটুকু এখন এক অতলান্ত মহাসমুদ্র।
অর্ক কফির কাপটা আলতো করে সরিয়ে রেখে খুব নিচু স্বরে ডাকল, “তিলোত্তমা।”
তিলোত্তমা ফোন থেকে চোখ না তুলেই অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল, “হুম, বলো। শুনছি।”
“তুমি বড্ড পাল্টে যাচ্ছ, তিলোত্তমা। দিন দিন কেমন যেন একটা চেনা অবয়বের ভেতর বড় বেশি অচেনা মানুষ হয়ে উঠছ।” অর্কের গলার স্বরে কোনো ক্রোধ ছিল না, ছিল কেবল এক বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস আর হারানোর তীব্র যন্ত্রণা।
এবার তিলোত্তমা ফোনটা টেবিলের ওপর রাখল। তার ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে শুকনো, তথাকথিত আধুনিকতার হাসি ফুটে উঠল। সে একটু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, “অর্ক, তুমি বড্ড ছেলেমানুষি করো। ইমম্যাচিউরিটির একটা সীমা থাকা উচিত। মানুষ তো সময়ের সাথে সাথে পাল্টাবেই। এটাই তো স্বাভাবিক বাস্তব। প্রকৃতির নিয়মই হলো পরিবর্তন। গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন না -‘You cannot step into the same river twice’? কারণ নদীও বয়ে যায়, আর মানুষটাও বদলে যায়। বসন্তের পর বর্ষা আসে, পুরনো জীর্ণ পাতা ঝরে গিয়ে গাছে নতুন পাতা গজায়। এই রূপান্তরকে সহজে মেনে নেওয়াই তো জীবন। এক জায়গায় স্থবির হয়ে থাকা তো জড়তা, ওটা তো মৃত্যু।”
তিলোত্তমার মুখে 'প্রকৃতির নিয়ম' আর দর্শনের এই সুবিধাবাদী দোহাই শুনে অর্কের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের আত্মিক অবহেলা আর উদাসীনতাকে আড়াল করার এই চেষ্টা অর্কের সহ্য হলো না। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা একটা মস্ত অশ্বত্থ গাছের দিকে তাকাল। বৃষ্টিভেজা পাতাগুলো দমকা বাতাসে কাঁপছে।
অর্ক একটা গভীর শ্বাস নিয়ে তিলোত্তমার চোখের দিকে সোজা তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো মায়া নেই, কেবলই যুক্তি, বাস্তবতা আর এক ধরণের যান্ত্রিক অহংকার।
অর্ক খুব শান্ত, অথচ ইস্পাতের মতো দৃঢ় গলায় বলতে শুরু করল, “প্রকৃতির দোহাই দিয়ে তুমি নিজের এই হারিয়ে যাওয়াটাকে জাস্টিফাই করছ, তিলোত্তমা? হেরাক্লিটাসের যে নদীর কথা তুমি বললে, সেই নদী তার স্রোত বদলায় ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরের জলের তৃষ্ণা মেটানোর মৌলিক ধর্মটা কখনো বদলে ফেলে না। নদী সাগরে মেশার জন্য ছোটে, কিন্তু সে কখনো বিষাক্ত মরুভূমি হয়ে যায় না। প্রকৃতি ঋতু বদলায়, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব বা সত্তা কি কখনো বদলে ফেলে? এই যে বাইরে অশ্বত্থ গাছটা দেখছ, বসন্ত এলে এর সব পাতা ঝরে যায় ঠিকই, শূন্য হয়ে যায় ডালপালা। কিন্তু পরের বার যখন নতুন পাতা গজায়, তা অশ্বত্থেরই পাতা হয়। গাছটা কখনো নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে বা সময়ের অজুহাতে বদলে গিয়ে বাবলা বা ক্যাকটাস হয়ে যায় না। প্রকৃতি তার রূপ বদলায়, চরিত্র বদলায় না।”
তিলোত্তমা কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু অর্ক তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। আজ অর্কের ভেতরের জমানো কথাগুলো বাঁধ ভাঙা নদীর মতো বেরিয়ে আসতে চাইল -
“মনোবিজ্ঞানী এরিখ ফ্রম তাঁর The Art of Loving বইতে লিখেছিলেন -ভালোবাসা কোনো সস্তা অনুভূতি নয় যা সময়ের স্রোতে ভেসে যায়, এটা একটা সক্রিয় সাধনা, একটা দায়িত্ব। তুমি যাকে পরিবর্তন বলছ, বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামুর ভাষায় তা আসলে 'Absurdity' বা এক ধরণের অস্তিত্বের ফাঁকি। মানুষ মানুষকে মানুষ করে তার ভেতরের মায়া, মমতা, সততা আর অনুভূতির পবিত্রতা দিয়ে। সময়ের সাথে সাথে মানুষের চিন্তা-ভাবনা পরিণত হওয়া উচিত, কিন্তু তার নিজস্ব সত্তা বা 'কোর আইডেন্টিটি' যদি হারিয়ে যায়, তবে তো সে আর সেই মানুষটাই রইল না।”
অর্ক একটু থেমে বলল, “রবীন্দ্রনাথের 'শেষের কবিতা'র সেই লাইনটা মনে আছে? ‘গ্রহণ করতে গেলে হাত পাততে হয়, দিতে গেলেও হাত বাড়াতে হয়; হাত যদি বন্ধ থাকে তবে দেওয়া-নেওয়া দুই-ই বন্ধ।’ তুমি তোমার মনের দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছ, তিলোত্তমা। আজ আমার সামনে যে তিলোত্তমা বসে আছে, তার গায়ের রঙ, তার গলার আওয়াজ এক হলেও ভেতরের মানুষটা তো সেই তিলোত্তমা নয় -যার সরলতা, যার পাগলামি আর মায়ার সাথে আমি আমার জীবনের সুতো বুনেছিলাম। তবে এই খোলস সর্বস্ব সম্পর্কের সার্থকতা কোথায়?”
ক্যাফের ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন একটা মৃদু রবীন্দ্রসংগীত বাজছিল -‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী...’। কিন্তু সেই চেনা সুর আজ যেন দুজনের মাঝখানের শূন্যতাকে আরও প্রকট করে তুলছিল।
অর্ক আবার বলতে শুরু করল, “যখন কেউ কোনো সম্পর্কে দাঁড়িয়ে অপরজনকে আকুল হয়ে বলে 'তুমি পাল্টে গেছ', সেটা কোনো সাধারণ অভিযোগ, সস্তা মান-অভিমান বা ঝগড়া নয় রে তিলোত্তমা। ওটা আসলে একটা সম্পর্কের ভেতর বেঁচে থাকা মানুষের তীব্র এক হাহাকার। জীবানন্দ দাশের সেই কবিতার মতো -‘সবচেয়ে সংহত স্তব্ধতা নেমে আসে যখন চেনা মানুষটি অচেনা হয়ে যায়।’ এটা হলো তার চেনা মানুষটাকে তার চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখার এক অসহায় কান্না।”
অর্কের গলা এবার আরও নিচু হয়ে এল, “প্রকৃতিতে রাত পেরিয়ে দিন আসে, কিন্তু সূর্য কখনো আলো দিতে ভুলে যায় না। চাঁদ কখনো তার শীতলতা হারিয়ে ফেলে না। অথচ তুমি এই তথাকথিত 'প্রকৃতির নিয়মের' অজুহাতে রোজ একটু একটু করে তোমার ভেতরের চেনা ওমটুকু নিভিয়ে ফেলছ। নিজেকে আধুনিক, প্র্যাক্টিক্যাল আর বাস্তববাদী প্রমাণ করার এই অন্ধ ইঁদুরদৌড়ে শামিল হতে গিয়ে তুমি আসলে তোমার ভেতরের আসল মানুষটাকেই খুন করে ফেলেছ।”
তিলোত্তমা এবার পুরোপুরি চুপ করে গেল। তার মুখের সেই যান্ত্রিক, অহংকারী হাসির রেখাটা পলকে মিলিয়ে গেছে। সে হয়তো টেবিলের দিকে তাকিয়ে অর্কর কথার গভীরতাটুকু মাপার চেষ্টা করছিল, অথবা তার ভেতরের মৃত কোনো এক কোণায় অপরাধবোধের একটা সূক্ষ্ম কাঁটা খচখচ করে উঠছিল।
অর্ক টেবিলের ওপর নিজের হাতটা রাখল, কিন্তু তিলোত্তমার হাতটা আর ছুঁল না। সে শেষবারের মতো বলল,
“ভালোবাসা যদি প্রকৃতির নিয়ম মেনে রোজ রঙ বদলায়, তবে সেই ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী ঝোড়ো বাতাসের মতো। আজ আছে, কাল নেই। কবি জন কিটস তাঁর হাইপেরিয়ন কাব্যে পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন সত্যের খাতিরে, কিন্তু আত্মবিস্মৃতির খাতিরে নয়। আমি বাতাসে ধূলিকণার মতো উড়তে আসিনি, তিলোত্তমা। আমি একটা মনের গভীরে বিশ্বাসের শিকড় ছড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ দেখছি, তুমি শুধু তোমার স্বভাবটাই বদলে ফেলোনি, তুমি তোমার ভেতরের সেই বিশ্বাসের শিকড়টাই উপড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছ।”
বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। আকাশের বুক চিরে নামা সেই বৃষ্টি যেন অর্কের ভেতরের সবটুকু মেঘকে ধুয়ে দিচ্ছিল।
অর্ক পকেট থেকে কফির বিলটা বের করে টেবিলের ওপর শান্তভাবে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে আর একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকাল না।
ক্যাফের কাঁচের দরজাটা ঠেলে সে যখন বাইরের রাজপথে পা রাখল, তখন বৃষ্টির জলে কলকাতার আলো-আঁধারি ধুয়ে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত একাকীত্ব কিন্তু একই সাথে এক পরম মুক্তি অর্ককে গ্রাস করল।
আর ক্যাফের ভেতরে আবছা অন্ধকারের টেবিলে একা বসে রইল এক নতুন তিলোত্তমা -যে প্রকৃতির নিয়ম মেনে হয়তো নিজেকে বদলে ফেলেছে, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে খাঁটি, সবচেয়ে অবিকৃত মায়াটুকু চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।
সে হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু হেরে গেছে তার নিজেরই অস্তিত্বের কাছে।
“যে সম্পর্কে চেনা মানুষটাই চোখের সামনে সম্পূর্ণ অচেনা এক পাথরে পরিণত হয়, সেই সম্পর্কটা কেবল একটা মৃত কঙ্কালের মতো টিকে থাকে। তার শরীরটা সমাজ দেখে, কিন্তু তার ভেতর কোনো আত্মা থাকে না।”
আর আমি কোনো মৃত আত্মাকে বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারব না।