নীরবতার নীল দেওয়াল
ক্যাফেটার কাঁচের জানালায় তখন শ্রাবণের বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটার পর একটা আছড়ে পড়ছিল। ঠিক যেমন করে অর্কের মনের ভেতর জমানো প্রশ্নগুলো বারবার তিলোত্তমার নীরবতার দুর্ভেদ্য দেওয়ালে এসে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়। টেবিলের ওপর কফি জুড়িয়ে জল হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের মাঝখানের সেই চেনা স্তব্ধতাটা আজ আরও বেশি ভারী, আরও বেশি দমবন্ধকর মনে হচ্ছে।
অর্ক বহুক্ষণ ধরে তিলোত্তমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তিলোত্তমার চোখে এক ধরণের আদিম ক্লান্তি, অথচ ঠোঁট দুটো শক্ত করে বন্ধ। সে একাকী এক অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে নিজের ভেতরে, যার আঁচ সে কাউকে পেতে দিতে চায় না। এমনকি অর্ককেও নয়। সে যেন নিজের দুঃখের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী, যেখানে অর্ক একজন সামান্য বহিরাগত মাত্র।
সবচেয়ে অদ্ভুত এবং বেদনার ব্যাপার হলো তিলোত্তমার সেই চিরচেনা সংলাপ। যখনই অর্ক তার চোখের ভেতরের শ্রাবণটাকে ছুঁতে যায়, তিলোত্তমা খুব সহজভাবে একটা মুখোশ পরে নেয়। সে হাসিমুখে বলে ওঠে, “আমি খুব ভালো আছি, অর্ক। আমার কিচ্ছু হয়নি। সত্যি বলছি, আই অ্যাম একদম ফাইন!”
এই 'আমি ভালো আছি' শব্দ কটা অর্কের কানে সীসার মতো বিঁধত। কারণ অর্ক তো সাধারণ কোনো পথচারী নয়; সে তিলোত্তমার চোখের ভাষার ভেতরের আলো-ছায়া চেনে। সে স্পষ্ট দেখতে পায়, ওই কৃত্রিম হাসির আড়ালে তিলোত্তমা কতটা দুঃখে, কষ্টে, আর কি এক ভয়ানক মানসিক দহনে দিন কাটাচ্ছে। তার মনের ভেতর যে প্রতিমুহূর্তে একটা ভাঙচুরের শব্দ হচ্ছে, তা অর্ক দূর থেকেও টের পায়। অথচ তিলোত্তমা সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মিথ্যে ভালো থাকার অভিনয় করে যায়।
অর্ক আর থাকতে না পেরে টেবিলের ওপর রাখা তিলোত্তমার বরফ-শীতল হাতটার ওপর নিজের হাত রাখল। তিলোত্তমা চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু অর্ক এবার ছাড়ল না। সে খুব কাতর, অথচ তীব্র এক অভিমানে বলতে শুরু করল,
“তিলোত্তমা, আর কতদিন? আর কতদিন তুমি নিজের চারপাশে এই নীরবতার দুর্গ বানিয়ে রাখবে? ওই 'আমি ভালো আছি'র মিথ্যে খোলসটা দয়া করে এবার অন্তত খোলো। তোমার অতীতে কী হয়েছে, কোন ঝড় তোমার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, তুমি কিচ্ছু আমাকে বলবে না? কেন তুমি একাই সমস্ত বিষপান করতে চাও?”
তিলোত্তমা আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক ধরণের তীব্র নিস্পৃহতা। সে বলল, “কিছু কথা নিজের ভেতরেই মরে যাওয়া ভালো, অর্ক। আমার দুঃখের বোঝা অন্য কাউকে দিয়ে আমি তার জীবনটা ভারী করতে চাই না। সাফারিং তো মানুষের ব্যক্তিগত জিনিস। তাছাড়া, আমার অতীতটা যদি আমি তোমাকে বলিও, তুমি কি সেটা বদলে দিতে পারবে? পারবে না। তবে কেন অনর্থক এই গল্প ঘাঁটা?”
তিলোত্তমার এই নির্মম প্র্যাক্টিক্যাল লজিক অর্ককেও ক্ষুব্ধ করে তুলল। তাদের মধ্যে এই একটা কারণেই বারবার ঝগড়া হয়, অভিমানের পাহাড় জমে। অর্ক এবার একটু এগিয়ে বসল। তার চোখ দুটো মায়ায় এবং আকুলতায় ভিজে এল। সে খুব শান্ত কিন্তু ধীর গলায় বলতে শুরু করল:
“তুমি বলছ আমি তোমার অতীত বদলে দিতে পারব না? হ্যাঁ, তিলোত্তমা, আমি জানি আমি ঈশ্বর নই। তোমার অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো অন্যায়, কোনো আঘাতকে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমি কোনো জাদুকর নই যে হাত বোলালেই তোমার সব ক্ষত উধাও হয়ে যাবে। কিন্তু তিলোত্তমা, আমি কোনো লজিকে কথা বলছি জানি না, তবে আমি এতটুকু জানি যে মানুষ যখন নিজের ভেতরের অন্ধকারকে কারো সামনে প্রকাশ করে, তখন তার মনটা অন্তত একটু হালকা হয়।”
অর্ক একটু থেমে বলল, “বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড একটা কথা বলেছিলেন -‘Unexpressed emotions will never die. They are buried alive and will come forth later in uglier ways.’ তুমি কি বোঝো না তিলোত্তমা, তুমি নিজেকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছ? তোমার ওই জোর করে টেনে আনা হাসির পেছনে যে কতটা কান্না লুকিয়ে আছে, তা কি আমি বুঝতে পারি না ভেবেছ?”
তিলোত্তমা এবার সোজা হয়ে অর্কের দিকে তাকাল। তার চোখে এক পলকের জন্য এক তীব্র আতঙ্ক দেখা গেল, যা সে পরক্ষণেই আড়াল করে নিল। সে বলল, “সবাই এক, অর্ক। আমি কাউকে বিশ্বাস করে একসময় আমার মনের কথা বলেছিলাম। ভেবেছিলাম সে শুনবে। কিন্তু মানুষ সেটাকে সহানুভূতি ভাবে, নয়তো দুর্বলতা ভেবে পরে সেটা দিয়েই আঘাত করে। আমি আর কারো সামনে নিজেকে কাটাকুটি করতে দিতে চাই না। আমি সত্যি ভালো আছি।”
অর্ক একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর One Hundred Years of Solitude উপন্যাসে লিখেছিলেন যে, একাকীত্ব হলো এমন এক ধরণের খোলস যা মানুষকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলে, কিন্তু মানুষ ভাবে সে সুরক্ষিত আছে। তুমিও ঠিক তাই করছ তিলোত্তমা। নোবেলজয়ী লেখিকা ওলগা তোকারচুক তাঁর দর্শনে বলেছিলেন -‘The worst thing about suffering is that it isolates you.’ রুশ কথাসাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি তাঁর Notes from Underground উপন্যাসে লিখেছিলেন -মানুষ কখনো কখনো নিজের দুঃখকে এত বেশি ভালোবাসতে শুরু করে যে সে তা থেকে মুক্ত হতেই চায় না। তুমিও কি তোমার ওই যন্ত্রণার খোলসটাকে ভালোবেসে ফেলেছ?”
অর্ক তিলোত্তমার হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে আরও কাছে এগিয়ে এসে বলল:
“রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটা গানে লিখেছিলেন -‘আপনারে দিয়ে রচিলি রে কী এ আপনারি কারাগার!’ তুমি নিজের চারপাশে এই নীরবতার যে নীল দেওয়াল তুলেছ, তা আসলে একটা আত্মিক কারাগার।”
অর্কের গলা এবার আরও গভীর হয়ে উঠল, “আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর The Old Man and the Sea উপন্যাসে দেখিয়েছিলেন -মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু হার মানে না। কিন্তু সেই লড়াইটা ছিল সমুদ্রের বিরুদ্ধে, নিজের ভালোবাসার মানুষের বিরুদ্ধে নয়। অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর De Profundis গ্রন্থে লিখেছিলেন, দুঃখ তখনই অপবিত্র হয়ে যায় যখন তা মানুষকে অহংকারী করে তোলে। তুমি ভাবছ একাই সব দুঃখ বহন করে তুমি খুব শক্তিশালী হচ্ছ? তুমি নিজেকে খুব গম্ভীর আর ম্যাচিউর প্রমাণ করছ? না তিলোত্তমা, না! তুমি আসলে একটু একটু করে পাথর হয়ে যাচ্ছো।”
অর্কের চোখে জল চিকচিক করছিল, “কবি সুফিয়া কামালের সেই আকুল লাইনের মতোই বলতে ইচ্ছে করে -‘কাহারো স্মরণে পরান কাঁদিলে তাহারে স্মরিও ভাই’। তোমার পরাণ ভেতরে কাঁদছে, আর বাইরে তুমি পাথরের মূর্তি সেজে বসে আছ!”
তিলোত্তমার চোখের কোণায় এবার এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। সে দ্রুত চোখটা মুছে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
অর্ক শেষবারের মতো তার থমথমে গলায় বলল,
“ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে ভালো সময় কাটানো নয় রে তিলোত্তমা। ভালোবাসা মানে হলো একে অপরের অন্ধকারের অংশ হওয়া। তুমি ভাবছ তুমি তোমার দুঃখ লুকিয়ে আমাকে ভালো রাখছ? অথচ তুমি যখন 'আমি ভালো আছি' বলে একাকী সাফার করো, তখন তোমার চেয়ে বেশি কষ্ট আমার হয়। কারণ আমি তোমার চোখের পেছনের মিথ্যাটা ধরতে পারি। আমি তোমার ওপর অধিকার ফলাতে আসি না তিলোত্তমা, আমি শুধু তোমার সেই ভাঙা টুকরোগুলোকে আলতো করে ছুঁয়ে দিতে চাই যা তুমি আঁচলে লুকিয়ে রেখেছ।”
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও মুষলধারে নামছে। তিলোত্তমা আর অর্কের দিকে তাকাতে পারল না, সে মাথা নিচু করে রইল। তার ভেতরের নীরবতার দেওয়ালে আজ হয়তো একটা বড় ফাটল ধরেছে, কিন্তু সেই ফাটল গলে মায়ার আলো ভেতরে ঢুকবে, নাকি সে আরও শক্ত করে 'ভালো থাকার' খোলসটা টেনে নেবে -সেই উত্তর কেবল শ্রাবণের এই অবিশ্রান্ত বৃষ্টিই জানত।
“আমি তো তোমার শুধু আলোটুকু চাইনি, তিলোত্তমা। আমি তোমার ভেতরের ওই কালো মেঘটাকেও আপন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে সেই সুযোগটাই দিলে না।”
ভালোবাসা মানে একে অপরের অন্ধকারের অংশ হওয়া।